পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় গুরুতর আহত ওয়াশিংটন পোস্টের চিত্রসাংবাদিক হাইডি লেভিন। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন স্থানীয় প্যালেস্তিনীয় তরুণেরা।
পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন ওয়াশিংটন পোস্ট-এর চিত্রসাংবাদিক হাইডি লেভিন। তাঁর দাবি, স্থানীয় প্যালেস্তিনীয় তরুণেরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হামলাকারীদের প্রতিরোধ না করলে হয়তো প্রাণেই বাঁচতেন না তিনি।
শুক্রবার রামাল্লার উত্তরে প্যালেস্তিনীয় গ্রাম আবু ফালাহে জলপাই সংগ্রহের খবর করতে গিয়েছিলেন লেভিন ও অন্য সাংবাদিকেরা। সেখানেই একদল মুখোশধারী ইজরায়েলি বসতিস্থাপনকারী তাঁকে মাটিতে ফেলে বেধড়ক মারধর করে। হামলায় তাঁর মেরুদণ্ডের চারটি কশেরুকায় ফাটল ধরে, দু’টি পাঁজর ভেঙে যায় এবং শরীরের চার জায়গায় ছিদ্রের মতো ক্ষত তৈরি হয়।
ক্ষতগুলি ছুরি, না অন্য কোনও অস্ত্রের আঘাতে হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে লেভিন জানিয়েছেন, এক প্রত্যক্ষদর্শী হামলাকারীদের হাতে এমন কয়েকটি কাঠের লাঠি দেখেছিলেন, যেগুলি থেকে পেরেক বেরিয়ে ছিল।
৬৪ বছরের লেভিন দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও সংঘাতের খবর সংগ্রহ করছেন। হামলার কয়েক দিন আগেই ইউক্রেনে কাজ সেরে ফিরেছিলেন তিনি। তাঁর ধারণা, শরীরে সুরক্ষাবর্ম ও মাথায় হেলমেট না থাকলে ওই দিন তাঁর মৃত্যু হতে পারত।
বুধবার ইজরায়েলের পেতাহ টিকভা শহরের হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কিছু ক্ষণ আগে লেভিন বলেন, “আমি সম্ভবত মারাই যেতাম। কারণ, মাথায় আঘাত করে একজন মানুষকে মেরে ফেলতে খুব বেশি কিছু লাগে না।”
তিনি মনে করিয়ে দেন, প্যালেস্তিনীয়দের ক্ষেত্রে এমন সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকে না। চলতি বছরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় এখনও পর্যন্ত ২০ জনেরও বেশি প্যালেস্তিনীয় নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পশ্চিম তীরজুড়ে প্যালেস্তিনীয়দের জমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগের মধ্যে এই হিংসা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ইজরায়েলের নিরাপত্তা নেতৃত্বের একাংশও বসতিস্থাপনকারীদের এমন কার্যকলাপকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে বর্ণনা করেছে।
লেভিন বলেন, “আমার ওপর হামলার ঘটনা দেখেছেন যে সাংবাদিকেরাই, তাঁদের প্রত্যেকের মনে হয়েছে—ওঁরা এবং আমি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে নিহত কত প্যালেস্তিনীয়ের শেষকৃত্যে গিয়েছি।”
‘তার পরেই যেন নরক নেমে এল’
লেভিনের বর্ণনা অনুযায়ী, আবু ফালাহে জলপাই সংগ্রহ শান্তিপূর্ণ ভাবেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু একসময় কাছের একটি টিলার মাথায় মুখোশধারী তরুণ বসতিস্থাপনকারীদের একটি দল এসে দাঁড়ায়। তারা প্যালেস্তিনীয় গ্রামবাসী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের উপর নজর রাখছিল। লেভিনের দাবি, ঘটনাস্থলে ইজরায়েলি সেনা পৌঁছনোর পরেই হামলা শুরু হয়।
তিনি বলেন, “তার পরেই যেন নরক নেমে এল। কয়েকজন কৃষক তাঁদের ত্রিপল আর সংগ্রহ করা জলপাইয়ের বস্তা গোটাতে শুরু করলেন। হঠাৎ মেশিনগানের আওয়াজ শুনলাম। তার পর দূরে কাঁদানে গ্যাস দেখতে পেলাম। আমি দৌড়তে শুরু করলাম… চারদিকে প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি। তার মধ্যেই হঠাৎ দেখি, ওদের জনা বারো আমার দিকে তেড়ে আসছে।”
এর পর তাঁকে মাটিতে ফেলে মারধর করা হয়। লেভিন জানান, তিনি কোনও ভাবে মুখ মাটির দিকে করে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে পেরেছিলেন। তাঁর কথায়, “তা না হলে আমার পুরো মুখটাই ভেঙে যেত। মস্তিষ্কে আঘাত লাগতে পারত, কিংবা একটা চোখ হারাতে পারতাম।”
তিনি আরও বলেন, “ওরা আমাকে লাথি মারতে আর লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করল। কত বার মেরেছে, গুনতেও পারব না। সম্ভবত একশো বারেরও বেশি। ওরা যাতে থামে, সে জন্য আমি মরে যাওয়ার ভানও করেছিলাম। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্যালেস্তিনীয় তরুণেরা গুলতি দিয়ে বসতিস্থাপনকারীদের দিকে পাথর ছুড়ে তাঁদের পিছু হটতে বাধ্য করার পরেই মারধর থামে। সেই সুযোগে আর এক মার্কিন সাংবাদিক জ্যাসপার ন্যাথানিয়েল লেভিনের কাছে পৌঁছন। অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে তাঁকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
লেভিনের কথায়, “শাবাবরা [প্যালেস্তিনীয় তরুণেরা] সামনে দাঁড়িয়ে ওদের [বসতিস্থাপনকারীদের] দূরে রাখার চেষ্টা করছিল। আমাদের চারপাশে একটা সুরক্ষার ঢাল তৈরি করেছিল। অসাধারণ ছিল সেই দৃশ্য। যেন বাইবেলে বর্ণিত কোনও যুদ্ধ।”
হামলার পর ন্যাথানিয়েল লেখেন, “শাবাবরা তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে না এলে তিনি হয়তো মারাই যেতেন। শুধু পাথর হাতে প্যালেস্তিনীয় তরুণেরা নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হাইডি লেভিনের জীবন বাঁচিয়েছেন—এ কথা বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না।”
ন্যাথানিয়েলের আরও অভিযোগ, ঘটনার পর সেনা হামলাকারীদের বদলে ওই প্যালেস্তিনীয় তরুণদেরই তাড়া করে। প্যালেস্তিনীয়েরা হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে বসতিস্থাপনকারী কিংবা সেনার গুলির মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে। কোনও অভিযোগ ছাড়াই তাঁদের দীর্ঘ সময় আটক রাখার আশঙ্কাও রয়েছে।
‘আমার মনোবল ভাঙতে পারেনি’
ইজরায়েলে চার দশক ধরে বসবাস করছেন লেভিন। তিনি জানিয়েছেন, সুস্থ হয়ে উঠলেই ফের পশ্চিম তীরে খবর সংগ্রহ করতে যাবেন। তাঁর কথায়, “আমার কাজটা গুরুত্বপূর্ণ। ওরা আমার শরীরে আঘাত করেছে, কয়েকটা হাড় ভেঙেছে। কিন্তু আমার মনোবল ভাঙতে পারেনি।”
হামলার পর বহু ইজরায়েলি নাগরিক তাঁকে চিঠি লিখে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও ফোন করে ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন লেভিন।
হারজগের সঙ্গে কথোপকথনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ফোনে ওঁকে যেন একটা আদুরে টেডি বিয়ার মনে হচ্ছিল। বারবার বলছিলেন, তোমাকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরতে চাই। বলছিলেন, এই লোকগুলো আমাদের দেশের পরিচয় বহন করে না, ওরা একটা কালো দাগ।” লেভিনের দাবি, হারজগ হামলাকারীদের ‘গুন্ডা’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
কিন্তু ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দফতর এক্স-এ একটি বিবৃতি প্রকাশ করে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও ভিডিয়োয় ধরা পড়া ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সেখানে ঘটনাটিকে ‘কথিত হামলা’ বলে উল্লেখ করা হয়।
নেতানিয়াহুর দফতরের একটি দাবি বিশেষ ভাবে ক্ষুব্ধ করেছে লেভিনকে। বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু ভিডিয়ো ফুটেজে দেখে মনে হচ্ছে, এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাঁকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর আবার উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করছেন।
লেভিনের বক্তব্য, “এটা সম্পূর্ণ বাজে কথা। ওরা আমাকে তুলে দাঁড় করিয়েছিল, কারণ আমার শরীর থেকে জিনিসপত্র খুলে নিতে পারছিল না। সেই জন্যই।”
তিনি জানান, তাঁর কাছে থাকা নথিপত্রের থলি, মার্কিন পাসপোর্ট, ক্রেডিট কার্ড, ক্যামেরার ডিস্ক এবং দু’টি অতিরিক্ত লেন্স-সহ একটি ছোট ক্যামেরার ব্যাগ লুট করা হয়। তাঁর কথায়, “আমার কাছে যা ছিল, সব লুট করেছে… ওই জন্যই ওরা আমাকে দাঁড় করিয়েছিল। তার পর আবার মাটিতে ফেলে দিয়ে লাথি মারতে আর পেটাতে থাকে।”
বিচার নিয়ে সংশয়ে সাংবাদিক
ইজরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই হামলাকে ‘ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কাজ’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। আবু ফালাহর ঘটনা এবং শনিবার পশ্চিম তীরের তাইবেহ গ্রামের কাছে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের উপর আর একটি হামলার পর ইজরায়েলি পুলিশ ১০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে।
তবে বুধবার ইজরায়েলের একটি আদালত লেভিনের উপর হামলায় সন্দেহভাজন চারজনকে হেফাজত থেকে মুক্তি দিয়ে গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ দেয়। আদালতের বক্তব্য, তাঁদের হেফাজতে রাখার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
হামলাকারীদের বিচার হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে লেভিন নিজের আস্থার মাত্রা দশের মধ্যে মাত্র দুই বলে জানান।
“আমি খুব একটা আশাবাদী নই,” বলেন তিনি। “অবশ্য সরকার যদি কিছু করার সিদ্ধান্ত নিত, এই সবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে লোকজনকে গ্রেফতার করতে চাইত, তা হলে করতে পারত। কিন্তু শুধু এই কিশোর গুন্ডাদের গ্রেফতার করলেই হবে না। তাদের নেতা, রাবাই বা ইহুদি ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা কী ভাবে সংগঠিত হচ্ছে, সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে।”
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেও লেভিনের বক্তব্য স্পষ্ট—এই হামলা তাঁর কাজ থামাতে পারবে না। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা পশ্চিম তীরে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, প্যালেস্তিনীয়দের উপর বসতিস্থাপনকারীদের হামলা এবং অভিযুক্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল।